তিনটি লোককাহিনী

ভূমিকা

বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির এক অমূল্য সম্পদ হলো লোককথা, কেচ্ছা, উপকথা এবং মুখে মুখে প্রচলিত হাস্যরসাত্মক গল্প। বাংলাদেশের গ্রাম থেকে ভারতের বাংলাভাষী জনপদ—প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এসব গল্প মানুষের মুখে মুখে বেঁচে আছে। কোথাও এগুলো নিছক হাসির খোরাক, কোথাও বা সমাজ, মানুষ ও সময়ের তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ।

এই সংকলনের গল্পগুলো সেই সমৃদ্ধ লোকঐতিহ্য থেকেই অনুপ্রাণিত। কিছু গল্প লোকমুখে প্রচলিত, কিছু প্রাচীন কাহিনির পুনর্কথন, আবার কিছু সমকালীন ভাবনায় নতুনভাবে রূপ দেওয়া। চরিত্র, স্থান কিংবা ঘটনার চেয়ে এখানে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মানুষের স্বভাব, অজ্ঞতা, বুদ্ধি, লোভ, অহংকার, রসিকতা এবং জীবনের চিরন্তন শিক্ষা।

এসব গল্পকে ইতিহাস বা নির্ভুল ঘটনা হিসেবে নয়, বরং লোকসাহিত্যের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী রচিত রসাত্মক ও শিক্ষামূলক কাহিনি হিসেবে পড়ার অনুরোধ রইল। যদি কোনো গল্প আপনাকে হাসায়, ভাবায় কিংবা নিজের সমাজকে নতুন চোখে দেখতে শেখায়—তবেই এই প্রচেষ্টা সার্থক।

আপনাকে স্বাগতম বাংলা লোকগল্পের এই আনন্দময় ভুবনে।

গল্প- ০১: দুুই মূর্খগ্রাম

পাশাপাশি দুটি গ্রাম—যদুপুর আর মধুপুর। মাঝখানে শুধু একটা ছোট্ট খাল, কিন্তু দুই গ্রামের মানুষের মধ্যে চিরকালীন বৈরিতা সাগরসমান!

এক গ্রামের লোক একটা কিছু করলে অন্য গ্রামের লোক তার দ্বিগুণ ঢাকঢোল পিটিয়ে জবাব দেওয়ার চেষ্টা করত। তাদের একটাই কথা—”আমরা তোদের চেয়ে সেরা!”

এ নিয়ে কথা-কাটাকাটি, চোখ-রাঙানি থেকে লাঠালাঠি-হাতাহাতিও লেগেই থাকত। কখনো কখনো তা বড় ধরনের সংঘাতেও রূপ নিত। এভাবেই চলছিল অনাদিকাল থেকে।

কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, দুই গ্রামের শত শত মানুষের কেউই লেখাপড়া জানত না। নিজের নামটাও লেখা দূরের কথা, কেউ অ, আ, ক পর্যন্ত লিখতে পারত না।

একদিন যদুপুরের এক মাতব্বর গ্রামের সবাইকে ডেকে বলল, “এভাবে চলতে পারে না। মধুপুরের চাষাভুষাগুলোর সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হলে আমাদের ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া শেখাতে হবে।”

যেই কথা, সেই কাজ! গ্রামের সবাই টাকা তুলে শহর থেকে একজন শিক্ষক নিয়ে এল। গ্রামের বড় বটগাছের তলে একচালা টিনের নিচে যদুপুরের বাচ্চারা সমস্বরে ‘অ আ ক খ’ চেঁচাতে লাগল।

খবর শুনে মধুপুরের লোকদের গায়ে যেন আগুন ধরে গেল! “কী! যদুপুরের ছেলেমেয়েরা পড়াশোনা শিখে আমাদের থেকে এগিয়ে যাবে, আর আমরা পিছিয়ে থাকব? তাছাড়া এটা নিশ্চিত তাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র!”

পরদিনই মধুপুরের মাতব্বররা বসল। দ্বিগুণ বেতনে অন্য এক শহর থেকে আরেক শিক্ষককে নিয়ে এল এবং পাঠশালার জন্য একটি দোচালা ঘর তৈরি করে দিল। যদুপুরের লোকেরা দেখুক—মধুপুরের লোকেরা কম যায় না। শুরু হলো দুই গ্রামেই সমান্তরাল পাঠশালা!

সবই ঠিকঠাক চলছিল, কিন্তু বিপত্তিটা বাঁধল কয়েক মাস পর—সাপ্তাহিক হাটে।

আলুর দাম নিয়ে দরদাম করতে করতে যদুপুরের এক প্রবীণ হঠাৎ গর্ব করে বলে বসল, “তোমাদের অত জোর কিসের? আমাদের মাস্টার যা বিদ্বান, শহরের লোকও তাঁর সামনে দাঁড়াতে পারে না!”

মধুপুরের লোকও ছাড়ার পাত্র নয়। ফোঁস করে উঠে বলল, “রাখো তোমার বিদ্বান! আমাদের মাস্টারের বিদ্যার সাগরে তোমাদের মাস্টার তো এক ফোঁটা জলও নয়!”

কথা বাড়তে বাড়তে হাটের মধ্যে হট্টগোল লেগে গেল। শেষমেশ সমাধান বের হলো—এভাবে কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। সামনাসামনি লড়াই হোক! দুই মাস্টার মুখোমুখি বসবেন, একে অপরকে প্রশ্ন করবেন। যে গ্রামের মাস্টার জিতবে, সেই গ্রাম চিরকালের জন্য জয়ী বলে গণ্য হবে!

একমাস পরে মধুপুরের গ্রাম্য হাটের বিরাট বটগাছের নিচে বসল সেই বিচারসভা।

উত্তেজনার পারদ তুঙ্গে। হাটে, মাঠে, ঘাটে—সব জায়গাতেই এক আলোচনা। সবার কথা, তাদের মাস্টারই সেরা। তাদের মাস্টারই জিতবে। মাস্টারদের কদরও হঠাৎ বেড়ে গেল। কেউ পুকুরের বড় মাছটি, কেউ গরুর সবটুকু দুধ, কেউ পালের হাঁস-মুরগি, কেউ গাছের ভালো ভালো ফল—যার যা সাধ্য, তা মাস্টারকে দিয়ে যায়। কথা একটাই—মাস্টারকে জিততেই হবে। বাজার থেকে ভালো ভালো ফল-ফলাদি, বিভিন্ন প্রকার মিস্টি দ্রবাদি ও আসতে লাগলো।

নির্ধারিত দিনে বিচারস্থল বটতলায় বিরাট মেলা বসে গেল। একপাশে যদুপুরের বাসিন্দারা, অন্যপাশে মধুপুরের। মাঝখানে দুটো কাঠের চেয়ারে গম্ভীর হয়ে বসেছেন দুই মাস্টারমশাই।

কিন্তু সমস্যা একটাই—দুই গ্রামের বিচারক হওয়ার মতো শিক্ষিত লোক একজনও নেই! সিদ্ধান্ত হলো, মাস্টাররা নিজেরাই নিজেদের প্রশ্ন করবেন, আর উত্তর শুনেই বোঝা যাবে কে কতটা জ্ঞানী।

প্রথমেই মধুপুরের মাস্টার চশমাটা নাকের ওপর ঠেলে দিয়ে গম্ভীর গলায় প্রশ্ন করলেন, “বলুন তো, মশাই, দিন আর রাত কেন হয়?”

যদুপুরের শিক্ষক একটু হেসে উত্তর দিলেন, “আহা, এ তো অতি সহজ কথা! পৃথিবীর আহ্নিক গতির কারণে।”

শুনে যদুপুরের পুরো গ্রাম একযোগে জয়ধ্বনি দিয়ে উঠল—”শোনো, শোনো! আমাদের শিক্ষক সেরা! কেমন এক পলকে উত্তর বলে দিলেন!”

এবার যদুপুরের মাস্টারের পালা। তিনি সোজা হয়ে বসে জিজ্ঞেস করলেন, “বেশ, তাহলে বলুন—সমুদ্রে জোয়ার-ভাটা কেন হয়?”

মধুপুরের শিক্ষক এক মুহূর্ত সময় না নিয়ে জবাব দিলেন, “চাঁদের আকর্ষণের কারণে!”

যদুপুরের লোক আর ধরে রাখতে পারল না নিজেদের! তারা একযোগে চিৎকার করে উঠল—”শাবাশ! আমাদের মাস্টার সবার সেরা! কেমন মোক্ষম জবাব দিয়েছেন!”

প্রশ্ন, উত্তর আর দুই পক্ষের উল্লাসে বটতলা যেন কেঁপে উঠতে লাগল। জল বহুদূর গড়িয়ে গেল। সকাল গড়িয়ে দুপুর, দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলো; কিন্তু কেউই কাউকে এক ইঞ্চি জমিও ছাড়তে নারাজ।

অবশেষে যদুপুরের মাস্টার শেষ ট্রাম্পকার্ডটি খেললেন। ইংরেজিতে একটু চাপ সৃষ্টি করার উদ্দেশ্যে গম্ভীর মুখে জিজ্ঞেস করলেন, “বলুন তো, ইংরেজি ‘I d’not know’ কথাটার অর্থ কী?”

মধুপুরের শিক্ষক মুচকি হেসে খাঁটি বাংলায় উত্তর দিলেন, “আমি জানি না।”

ব্যাস! আর যায় কোথায়! “আমি জানি না।” শোনামাত্রই যদুপুরের মাতব্বর লাফিয়ে উঠল! সঙ্গে পুরো যদুপুরবাসী! তারা মুহূর্তের মধ্যে সমস্বরে চিৎকার করে উঠল—

“শুনেছ সবাই? শুনেছ? ওদের মাস্টার নাকি পারে না! হা হা হা! মাস্টার নিজেই বলে দিয়েছে—’সে জানে না!’ আমাদের মাস্টার সবার সেরা!”

দুই শিক্ষক দুজনের দিকে হা হয়ে তাকিয়ে রইলেন।

যদুপুরের মাস্টারকে ঘাড়ের ওপর তুলে নাচতে নাচতে ঢাকঢোল বাজিয়ে গ্রামের দিকে রওনা দিল। এই বুনো উল্লাসে মাস্টারের প্রাণ যায় যায়!

অন্যদিকে, মধুপুরের লোকজন লজ্জায়, অপমানে মাথা নিচু করে থাকল। তাদের নিজেদের শিক্ষক যে ভরা সভায় “জানি না” বলে সব সম্মান ডুবিয়েছেন! মধুপুরের মাস্টার বিপদ বুঝে যদুপুরের লোকের ভিড়ে মিশে পালিয়ে প্রাণরক্ষা করলেন।

যদুপুরের মাস্টার ভাবলেন, “এরা যে মাপের মূর্খ, আজ প্রাণ হাতে পেয়েছি—এই-ই অনেক। এখানে আর নয়!” তিনি ভোর হওয়ার আগেই গ্রাম থেকে পালালেন।

ঘটনাটি চারদিকে রটে গেল। এরপর আর কোনো শিক্ষক সেই দুই গ্রামে আসতে রাজি হলেন না।

যদুপুর আর মধুপুর—দুই গ্রামই আবার আগের মতো নিরক্ষর, মহামূর্খ আর চিরন্তন রেষারেষিতে মত্ত রয়ে গেল।

গল্প- ০২: গোল আলু

সমু ক্লাস ফাইভের ছাত্র। তার একটি মজার সমস্যা আছে—সে ‘ল’ বর্ণটি উচ্চারণ করতে পারে না। ‘ল’-এর বদলে সে বলে ‘ড়’।
লাটিমকে বলে ড়াটিম।
লালকে বলে ড়াড়।
এমনই তার উচ্চারণের সমস্যা।
বাংলা স্যার ভীষণ মজার মানুষ। একদিন তিনি সমুর বিষয়টি নিয়ে ছোট্ট একটি পরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিলেন। টেবিলের ওপর দশ টাকার একটি চকচকে নতুন নোট রাখলেন। এমন নোট দেখলে যে কারো ই পাওয়ার ইচ্ছে জাগে।
তিনি সমুকে ডেকে বললেন,
— টেবিলের ওপর চকচকে নোটটা দেখছ?
— জ্বি, স্যার।
— আজ যদি তুমি ‘গোলআলু’ বলতে পারো, এই নতুন নোটটি তোমাকেই দেব।

নতুন দশ টাকার নোট পাওয়ার কথা শুনে সমু’র চোখ-মুখ আনন্দে ঝলমল করে উঠল। সে তাড়াতাড়ি ফুলশার্টের দুই হাতা গুটিয়ে টেবিলের সামনে এসে দাঁড়াল। ভঙ্গিটা এমন, যেন এই মুহূর্তেই সে পুরস্কার জিতে নিয়েছে। তাকে নিয়ে সহপাঠীদের ঠাট্টার উপযুক্ত জবাব সে আজ দিবেই দিবে!

সে একবার বুক ভরে নিঃশ্বাস নিল। উত্তেজনায় তার বুক ধড়ফড় করছে। তারপর বুকে হাত রেখে নিজেকেই সাহস দিল। এখন সে আত্মবিশ্বাসে টইটম্বুর।
হঠাৎ টেবিলে সজোরে এক থাপ্পড় মেরে সিংহের মতো গর্জে উঠল—
— মন রে মন, একবার বল… গোরআলু!
মুহূর্তেই ক্লাসশুদ্ধ ছেলেরা দমফাটা হাসিতে ফেটে পড়ল।

ঘটনার আকস্মিকতা আর ছাত্রদের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় মাস্টারমশাই সমু’র ভবিষ্যৎ বিড়ম্বনার স্পষ্ট ছবি দেখতে পেলেন। নিষ্কলুষ সমু’র করুণ মুখের দিকে নিরবে চেয়ে রইলেন।

টেবিলের ওপর রাখা হাস্যোজ্জ্বল নোটটি ব্যথিত চিত্তে নীরবে পড়ে রইল—পুরস্কার হিসেবে নয়, বরং সমুর ব্যর্থ প্রচেষ্টার নির্বাক সাক্ষী হয়ে।

সেদিনের সেই ঘটনার পর থেকে স্কুলে সমু’র আসল নামের সাথে আরো একটা নতুন নাম যোগ হল “গোরআলু “—
আড়ালে আবডালে কারনে অকারনে সবাই তাকে —‘গোরআলু’ নামে ডাকতে শুরু করল।

ফুড়ুৎ

এক রাজ্যে এক রাজা ছিলেন। তাঁর ছিল একমাত্র কন্যা। রাজকন্যা ছিলেন অপরূপ সুন্দরী। কিন্তু সৌন্দর্যের সঙ্গে ছিল ভীষণ জেদ, আর নিজের বুদ্ধি নিয়ে ছিল অগাধ অহংকার।

রাজকন্যা মনে করতেন, পৃথিবীতে তার মত জ্ঞানী আর কেউ নেই। তার প্রশ্নের উত্তর পৃথিবীর কেউ দিতে পারবে না। আর এমন কোনো মানুষ নেই যে তাঁকে হারাতে পারে।

রাজকন্যার বিয়ের বয়স হলো। রাজা চাইলেন, তাঁর কন্যার জন্য একজন যোগ্য পাত্র খুঁজে বের করতে। দূর-দূরান্তে খবর পাঠানো হলো—রাজকন্যার জন্য উপযুক্ত পাত্র চাই।

খবর পেয়ে অনেক রাজপুত্র, যুবরাজ ও বীর যুবক রাজদরবারে এসে হাজির হলো। কিন্তু রাজকন্যা জানালেন, বিয়ের আগে তিনি তাদের একটি পরীক্ষা নেবেন।

তিনি রাজসভায় দাঁড়িয়ে ঘোষণা করলেন—

“আমার একটি প্রশ্ন আছে। যে আমার সেই প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে পারবে, আমি কেবল তাকেই বিয়ে করব। শুধু তাই নয়, সে পাবে রাজ্যের অর্ধেক অংশের অধিকার। আর যে উত্তর দিতে পারবে না, তাকে কারাগারে বন্দি করা হবে।”

তারপর শুরু হলো রাজদরবারে একের পর এক পরীক্ষা।

রাজকন্যা সবাইকে সামনে বসিয়ে শুধু একটি প্রশ্ন করতেন—

— “তারপর?”

প্রথমে সবাই অবাক হয়ে যেত। এত ছোট প্রশ্নের উত্তর দেওয়া আবার কঠিন কী?

কিন্তু যতই উত্তর দিতে যেত, ততই রাজকন্যার প্রশ্ন চলতে থাকত—

— “তারপর?”

— “তারপর?”

— “তারপর?”

একসময় সবাই থেমে যেত। আর সেই ব্যর্থতার শাস্তি হিসেবে তাদের যেতে হতো কারাগারে।

দিন যেতে লাগল। রাজ্যের কারাগার ভরে উঠতে লাগল ব্যর্থ পাত্রদের ভিড়ে। মানুষের মনে ভয় আর হতাশা ছড়িয়ে পড়ল।

গ্রামের প্রবীণেরা এই ঘটনা শুনে চিন্তায় পড়লেন। তাঁরা ঠিক করলেন,

“এভাবে চলতে থাকলে অকারণে কত মানুষের জীবন নষ্ট হবে! রাজকন্যার এই জেদের অবসান ঘটাতে হবে।”

অনেক ভাবনাচিন্তার পর তাঁরা গ্রামের এক সরল-সোজা, শান্ত স্বভাবের ছেলেকে রাজদরবারে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিলেন।

ছেলেটিকে যাওয়ার আগে তাঁরা বললেন,

“মনে রেখো, রাজকন্যার প্রশ্নের উত্তর মুখস্থ জ্ঞান দিয়ে নয়, বুদ্ধি আর ধৈর্য দিয়ে দিতে হবে।” আর কীভাবে কী করতে হবে তা বুঝিয়ে দিলেন।

ছেলেটি রাজপ্রাসাদে পৌঁছাল।

রাজসভা ভরা মানুষ। সবাই অপেক্ষা করছে—আজও কি আরেকজন বন্দি হবে?

রাজকন্যা মুচকি হেসে বললেন—

— “তুমি কি আমার প্রশ্নের উত্তর দিতে প্রস্তুত?”

ছেলেটি শান্তভাবে মাথা নত করে বলল—

— “জি, রাজকন্যা। আপনি প্রশ্ন করুন।”

রাজকন্যা বললেন—

— “তারপর?”

ছেলেটি গল্প শুরু করল…

— “আমি আপনাকে বিয়ের প্রস্তাব দিতে রাজসভায় এলাম।”

রাজকন্যা সঙ্গে সঙ্গে বললেন—

— “তারপর?”

ছেলেটি বলল—

— “আপনার আমাকে পছন্দ হলো। আমাদের বিয়ে হলো।”

— “তারপর?”

— “আমরা সুখে-শান্তিতে সংসার করতে লাগলাম।”

— “তারপর?”

— “একদিন আপনি বললেন, ‘যাও, মাছ ধরে নিয়ে এসো।'”

— “তারপর?”

— “আমি ঝাঁকি জাল নিয়ে মাছ ধরতে গেলাম।”

— “তারপর?”

— “অনেক চেষ্টা করেও একটি মাছও পেলাম না।”

— “তারপর?”

— “হঠাৎ দেখি, ডাঙার ওপর এক ঝাঁক বাবুই পাখি বসে আছে।”

— “তারপর?”

— “আমি জাল ছুড়ে দিলাম।”

— “তারপর?”

— “দেখি, পুরো জাল পাখিতে ভরে গেছে।”

— “তারপর?”

— “ভাবলাম, এত পাখি নিয়ে যাব কীভাবে? তাই জালে একটি ছোট ফুটো করে দিলাম।”

— “তারপর?”

— “পাখিগুলো একে একে ফুড়ুৎ করে বের হতে লাগল।”

— “তারপর?”

— “ফুড়ুৎ।”

— “তারপর?”

— “ফুড়ুৎ।”

— “তারপর?”

— “ফুড়ুৎ।”

এভাবেই চলতে লাগল—

রাজকন্যার “তারপর?” আর ছেলেটির “ফুড়ুৎ”।

শেষে রাজকন্যাই বিরক্ত হয়ে বললেন—

— “তোমার এই ফুড়ুৎ আর কতক্ষণ চলবে?”

ছেলেটি শান্তভাবে উত্তর দিল—

— “রাজকন্যা, আপনার ‘তারপর’ যখন শেষ হবে, আমার ‘ফুড়ুৎ’ও তখনই শেষ হবে।”

রাজসভা নীরব হয়ে গেল।

রাজকন্যা প্রথমবার বুঝলেন, শুধু জেদ আর অহংকার দিয়ে সবাইকে হারানো যায় না। কখনো কখনো সরল মানুষের মধ্যেও লুকিয়ে থাকে অসাধারণ বুদ্ধি।

তিনি নিজের পরাজয় স্বীকার করলেন। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সেই সরল ছেলেকেই বিয়ে করলেন।

রাজা আনন্দের সঙ্গে কারাগারের সব বন্দিকে মুক্তি দিলেন। রাজ্যে ফিরে এলো শান্তি ও আনন্দ।

সেদিন থেকে রাজকন্যার অহংকার ভেঙে গেল। তিনি বুঝলেন—বুদ্ধি, ধৈর্য আর বিনয়ই মানুষের আসল গুণ।

শিক্ষা:
অহংকার ও অর্থহীন জেদ শেষ পর্যন্ত ধৈর্য, বুদ্ধি এবং উপস্থিত বুদ্ধির কাছে পরাজিত হয়।

Previous Article

স্বামী বিবেকানন্দের ২৫০টি বাণী সংকলন

Write a Comment

Leave a Comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Subscribe to our Newsletter

Subscribe to our email newsletter to get the latest posts delivered right to your email.
Pure inspiration, zero spam ✨
Translate »