আমার মনে হয় জীবনানন্দের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের নন্দনতাত্ত্বিক দূরত্ব এইখানে, যেখানে জীবনানন্দের সমসাময়িক বিখ্যাত কবিরা চেষ্টা করছিলেন রবীন্দ্রনাথ থেকে সম্পূর্ণভাবে বেরিয়ে একটি নতুন জগৎ তৈরি করতে, কিন্তু তারা সেই চেষ্টায় সম্পূর্ণ সফল হতে পারছেন না। অনেকে অনন্য সব সৃষ্টি করলেও তাদের ভিতরে রবীন্দ্র ভাবধারা থেকে যাচ্ছে। আশঙ্কার মাঝেও রবীন্দ্রনাথ মনে মনে হয়তো একটা তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলছেন এবং মতপার্থক্য, দৃষ্টিভঙ্গির ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও তাদেরকে স্নেহ করছেন; কিন্তু জীবনানন্দ উজ্জ্বল ব্যতিক্রম, যে রবীন্দ্রনাথের ধারা থেকে বের হয়ে বাংলা কবিতার একটি সম্পূর্ণ নতুন কাব্যভাষা প্রয়োগ এবং স্বতন্ত্র ধারার প্রবর্তন করেন, যেটা রবীন্দ্রনাথ সেভাবে বুঝতে পারছেন না—যেমনটি বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে পাশ্চাত্যের আধুনিক কবিতা। আমার কাছে মনে হয় রবীন্দ্রনাথ ও জীবনানন্দের সম্পর্কের নন্দনতাত্ত্বিক ট্রাজেডি এখানেই নিহিত!
এখানে আরেকটি কথাও মনে রাখতে হবে, অন্যান্য কবিরা রবীন্দ্রনাথের কাছে যাচ্ছেন, পড়ে থাকছেন; কিন্তু অন্তর্মুখী জীবনানন্দ সেভাবে রবীন্দ্র সান্নিধ্যে যাচ্ছেন না, যদিও তিনি মনে মনে রবীন্দ্রসান্নিধ্য ও স্বীকৃতি চাচ্ছেন। মূলত রবীন্দ্রনাথ তখন সাহিত্য অঙ্গনের অভিভাবক, মহীরূহ, গুরুদেব। এমতাবস্থায় রবীন্দ্রনাথের পক্ষে জীবনানন্দের কাছে যাওয়ার প্রশ্ন আসে না। তাই অন্যান্য বিখ্যাত সাহিত্যিকদের মত জীবনানন্দ রবীন্দ্রনাথের কাছে না যাওয়ার কারণে সেভাবে সরাসরি সান্নিধ্য পায় নাই। জীবনানন্দের মন চাইছে রবীন্দ্র সান্নিধ্য, কিন্তু তা তার স্বভাববিরুদ্ধ। অন্যদিকে অর্থনৈতিক অস্বচ্ছলতা, তা দূরীকরণের কূলকিনারাহীন অনিশ্চয়তা এবং দাম্পত্যকলহের টানাপোড়নে বিপর্যস্ত মন হয়তো সঙ্গপ্রিয়তার চেয়ে বেশি সুখ পাচ্ছে সৃষ্টিতে, যা তার আজন্ম প্যাশন, রক্তে জড়িত ও আত্মায় মিশ্রিত, সম্ভবত অবসম্ভাবী ভমিতব্য! যে সৃষ্টি একেবারে স্বতন্ত্র—যার শিকড় চেতনার মর্মমূলে প্রোথিত—বিশ্বসাহিত্যে এর নজির থাকলেও বাংলা সাহিত্যে একেবারে অপরিচিত। বাংলা পাঠক তো বটেই, সমালোচকগণও হিমশিম খাচ্ছে, গলদঘর্ম হচ্ছে—এই নতুন কাব্যভাষা ও ভাবনার সাথে নিজেকে মিলাতে। সমকালে তাকে বুদ্ধদেব ছাড়া আর কেউ তা তেমন বুঝছেন না। রবীন্দ্রনাথকে আধুনিকতার সাথে খাপ খাওয়াতে সর্বোতভাবে চেষ্টা করছেন—এ বিষয়ে তাকে সহযোগিতা করছেন তার সেক্রেটারি অমিয় চক্রবর্তীসহ অনেক ঘনিষ্ঠ বিশিষ্ট সহচর; কিন্তু তিনি যেন তপোবনের ঘেরাটোপে আবদ্ধ। জীবনের এই দিকে তার বিশ্বাস তাকে প্রবেশ করতে দিচ্ছে না…. কল্যাণময়ী সাহিত্যচেতনার বাইরের সত্য ও সৌন্দর্য যথাযথভাবে অনুধাবনে একটা স্পষ্ট দেয়াল তৈরি হয়েছে… যা তিনি ভাঙতে পারছেন না… আটকে যাচ্ছেন মানবতাবাদী সাহিত্যচিন্তায়!!
বিনয় মজুমদারের ভাষায়….
“ধূসর জীবনানন্দ, তোমার প্রথম বিস্ফোরণে
কতিপয় চিল শুধু বলেছিলো, ‘এই জন্মদিন’।
এবং গণনাতীত পারাবত মেঘের স্বরূপ
দর্শনে বিফল ব’লে, ভেবেছিলো, অক্ষমের গান।
“এখন সকলে বোঝে, মেঘমালা ভিতরে জটিল
পুঞ্জীভূত বাষ্পময়, তবুও দৃশ্যত শান্ত, শ্বেত,
বৃষ্টির নিমিত্ত ছিলো, এখনো রয়েছে, চিরকাল
রয়ে যাবে; সংগোপন লিপ্সাময়ী, কম্পিত প্রেমিকা—তোমার কবিতা, কাব্য,”
বিনয় মজুমদার কি রবীন্দ্রনাথকে ও অক্ষমের দলে নাকি কপিতয় চিলের দলে রেখেছেন?
ষোল বছরের জীবনানন্দের চিঠির জবাবে রবীন্দ্রনাথ লিখছেন…..
আমার মনে হয় প্রত্যেক বাঁকবদলকারী সাহিত্যিক এক একটি আলাদা নক্ষত্র তাদের বৈশিষ্ট্যই অন্যদের সাথে মিশে যাওয়া নয় বরং স্বমহিমায় জ্বলজ্বল নিজ নিজ সার্বভৌম পতাকা উড়ানো। এজন্যই হয়তো রবীন্দ্রনাথ তার দুই মহান উত্তরসূরি মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত এবং সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় থেকে অকাতরে গ্রহন করেছেন কিন্তু সেই পথকে শিরোধার্য করেন নাই জীবনানন্দ ও মুলত তাই করেছেন। দ্বিধাহীনচিত্তে রবীন্দ্রনাথের শ্রেষ্ঠত্ব মেনে নিয়েছেন কিন্তু রবীন্দ্রসৃষ্টিতে আটকে থাকেন নাই। নিউটন কি আটকে ছিলেন পূর্বসূরীতে বা আইনস্টাইন নিউটনে বা হকিং আইনস্টানে?
নক্ষত্রের বৈশিষ্ট্য মহাজগতের ভিতরে থেকেও আপন আপন জ্যোতিতে ভাস্বর হয়ে প্রজ্জ্বলিত হওয়া এবং প্রভাবিত করা। বাংলা সাহিত্যে মাইকেল, বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথ ও জীবনানন্দ ও তাই!!!